দিগন্ত ডেক্স : মসজিদ পৃথিবীর বুকে মহান আল্লাহ তাআলার ঘর। আর মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা এবং এর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা শুধু কোনো পদমর্যাদা নয়, বরং এটি এক মহান ‘আমানত’।
এই আমানতের যথাযথ হক আদায় শুধু তখনই সম্ভব, যখন এর দায়িত্বে থাকবেন এমন একদল মানুষ, যারা দ্বিন পালনে সচেষ্ট, তাকওয়ার অধিকারী, যাদের চরিত্রে রয়েছে সততা এবং কর্মে রয়েছে প্রশাসনিক প্রজ্ঞা।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পবিত্র আমানত এক চরম সংকটের মুখোমুখি।
যে মসজিদ হলো সমাজের শুদ্ধতম স্থান, আজ তা হীন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। দ্বিন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং হারাম সম্পদের দম্ভ নিয়ে একদল অযোগ্য ও নীতিহীন ব্যক্তি দলীয় ক্ষমতার দাপটে মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কক্ষ পর্যন্ত নিজেদের কবজায় নিয়ে নিচ্ছে। তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে একদল চাটুকার ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা নিজেদের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য মহান আল্লাহর ঘরকে ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না। এই কার্মকাণ্ড করে তারা নিজেদের দ্বিন-ঈমানকে কত বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে ছাগল পালে ছেড়ে দিলে তারা যতটা না ক্ষতি করে, পদের লোভ ও মালের লিপ্সা মানুষকে দ্বিনের ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৬)
এখনকার কমিটিরা মনে করে, জাঁকজমকতা, সাজসজ্জা ও বাহ্যিক চাকচিক্যকের উন্নতিই মসজিদের মূল কাজ। এই বিষয়টিতে সতর্ক করে রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘যখন মানুষ মসজিদের জাঁকজমকতা ও সৌন্দর্য নিয়ে একে অপরের সঙ্গে গৌরব করবে, তখন তোমরা কিয়ামতের জন্য অপেক্ষা করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৪৯)
মসজিদ কমিটির সদস্যদের গুণাবলি : আল্লাহর ঘর পরিচালনার মতো পবিত্র ও গুরুভার দায়িত্ব পালনের জন্য কমিটির সদস্যদের মধ্যে নিন্মোক্ত গুণাবলিগুলো অপরিহার্য।
ঈমানি ও আধ্যাত্মিক গুণাবলি : * আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস : অন্তরে এই বিশ্বাস রাখা যে মসজিদ শুধু আল্লাহর এবং এর মালিকানা শুধু তাঁরই।
* পরকালের জবাবদিহি : কমিটির প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, এই ভয় অন্তরে রাখা। দুনিয়াবি নাম-যশের লোভ বর্জন করা।
* সালাত কায়েম করা : যিনি নিজেই জামাতে নামাজ পড়েন না, তার মসজিদের খাদেম হওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। সদস্যদের অবশ্যই নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাবন্দ হতে হবে।
* জাকাত প্রদান : এটি তার আর্থিক স্বচ্ছতা ও দ্বিনের প্রতি ত্যাগের প্রমাণ। হারাম সম্পদের মালিক বা কৃপণ ব্যক্তি কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য নন।
* একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা : কোনো রাজনৈতিক নেতা, ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপে অন্যায় সিদ্ধান্ত না নেওয়া। ন্যায়ের ওপর অটল থাকার সাহস থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, পরকালকে বিশ্বাস করে, সালাত আদায় করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না—তারাই আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করবে।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ১৮)
আকিদাগত পরিচ্ছন্নতা : মসজিদ হলো তাওহিদের কেন্দ্র। তাই কমিটির সদস্যদের হতে হবে—
* শিরক ও বিদআতমুক্ত : যারা আকিদাগতভাবে বিশুদ্ধ এবং সুন্নাহর অনুসারী। অতএব কোনো বিদআতি ও কুসংস্কার বা দ্বিনবহির্ভূত কাজে লিপ্ত ব্যক্তি মসজিদের কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য নয়।
* সুন্নাহর অনুসারী : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ পালনকারী হওয়া।
চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলি : * আমানতদার : মসজিদের ফান্ডের প্রতিটি পয়সার সঠিক হিসাব রাখা। মসজিদের সম্পদকে নিজের বা দলের কাজে ব্যবহার না করা।
* সততা ও স্বচ্ছতা : আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো লুকোচুরি না করা এবং দায়িত্বশীলদের সামনে তা পেশ করা।
* অহংকারমুক্ত থাকা ও বিনয়ী হওয়া : মুসল্লিদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার না করে নম্র ও ধৈর্যশীল হওয়া। প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা : ওপরের গুণাবলির পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও থাকতে হবে। (ফাতাওয়া শামি : ৪/৩৮০, বাহরুর রায়েক : ৫/২৪৪)
আমাদের কর্তব্য : আমাদের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো, মসজিদকে আমানত হিসেবে দেখা। কারণ মসজিদ কমিটি কোনো সামাজিক পদ, রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র বা ব্যক্তিগত সম্মান অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অর্পিত এক ভয়ংকর দায়িত্ব। তাই কমিটি গঠনের সময় দ্বিনদারি, আমানতদারি ও যোগ্যতাকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলীয় পরিচয় বা আর্থিক প্রভাবকে এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে মুসলিমরা!) নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যে তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ইনসাফের সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের যে বিষয়ে উপদেশ দেন, তা কতই না উত্কৃষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু শোনেন, সব কিছু দেখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৭)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যখন দায়িত্ব (আমানত) অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হয়, তখন তোমরা কিয়ামতের প্রতীক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯)
মহল্লাবাসী ও মুসল্লিদের দায়িত্ব হলো, নীরব দর্শক হয়ে না থাকা। অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে বসানো বা দায়িত্বে রেখেও গাফিলতির সুযোগ দেওয়া মানে সেই খেয়ানতের অংশীদার হওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়; যদি তাতে সক্ষম না হয়, তবে মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে)…।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৯) লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
Leave a Reply