মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন

ব্যবসায়িক মন্দায় বন্ধ হলো কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১২ পঠিত

ডেক্স নিউজ : একসময় রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর একটি ছিল শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানে ছিল নামী ব্র্যান্ডের শোরুম, পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রীর দোকান। ছিল ফুড কোর্ট ও বাগানও।

তবে সময়ের সঙ্গে কমেছে ক্রেতা, বন্ধ হয়েছে একের পর এক দোকান। শেষ পর্যন্ত টানা লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে না পেরে চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক গুরুত্ব হারিয়েছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি।শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন, করোনাকালে ব্যবসায়িক মন্দা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং ক্রেতাদের আস্থার সংকট—এসব কারণে বিপণিবিতানটি পিছিয়ে পড়ে। এর সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার প্রসার ও বড় শপিং মলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ২০ তলা ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ওপরের তলাগুলো আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।চালুর সময় বিপণিবিতানটিতে দোকান ছিল ১৯৮টি। তবে বন্ধ ঘোষণার সময় চালু ছিল মাত্র ১৭টি। ক্রেতাসংকটে অধিকাংশ দোকান আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় থেকেই বিপণিবিতানটির ব্যবসায়িক পতন শুরু হয়। ২০১৬-১৭ সালের দিকে নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের সড়কে যানজট, ধুলাবালি ও চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়।

তখন বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অন্য মার্কেটে চলে যান। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তারা আর ফিরে আসেননি।

তিনি বলেন, করোনাকালে ব্যবসায় বড় ধস নামে। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে দেন। এ ছাড়া অনলাইনে কেনাকাটা বাড়ায় ক্রেতারা আগের মতো মার্কেটে আসছেন না। এই বিপণিবিতানে পণ্যের বৈচিত্র্যও কম ছিল। ফলে এক জায়গায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনার সুযোগ না থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহ কমতে থাকে।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি চালু রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো বলে জানান বাকী বিল্লাহ ওসমানী। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় সমিতির কর্মকর্তা ও কয়েকজন দোকানমালিক ঋণ নিয়ে ছয় থেকে আট মাস বিপণিবিতানটি চালু রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচের বকেয়া বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিপণিবিতানটির বিদ্যুৎ বিল ৬০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া পড়েছে। দীর্ঘদিনের লোকসান ও পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় দোকানমালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।

ব্যবসায়িক পতনের পেছনে পণ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের পণ্য বিদেশি বা নামী ব্র্যান্ডের বলে বিক্রি করতেন। এতে বিপণিবিতানটির প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়।

অন্যদিকে, ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কেনাকাটার বিস্তার এবং বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ব্যবসায়িক সংকট আরো বাড়িয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারাও বিপণিবিতানটির পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হলেও ভবনটির ওপরের তলাগুলোর আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো চালু রয়েছে। বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু বিপণিবিতানের বাণিজ্যিক অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে নির্মিত এই বিপণিবিতানের অধিকাংশ দোকান আগেই ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে ভবনটি বিক্রি অথবা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে ভাবছেন মালিকেরা। গত দুই বছর ধরে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খোঁজার চেষ্টা করেও সফল হননি তারা।

একসময় রাজধানীর অভিজাত কেনাকাটার অন্যতম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বন্ধ হয়ে যাওয়া নগরীর পরিবর্তিত ব্যবসায়িক বাস্তবতারও প্রতিফলন। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন, অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার, প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রতিষ্ঠিত বিপণিবিতানও যে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাতে পারে, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পরিণতি তারই উদাহরণ।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক ক্লিকে বিভাগের খবর
© All rights reserved © 2023 digantabangla24.com