Logo
নোটিশ ::
Wellcome to our website...

আদিবাসী সম্প্রদায়ের পথিকৃৎ মনীন্দ্র নাথ মারাক

রিপোর্টারের নাম / ৫১৪ বার
আপডেট সময় :: সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

তোবারক হোসেন খোকন : ‘‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে – মলিন মর্ম মোছায়ে, মম পুন্য কিরণ দিয়ে যাক মোর – মোহ কালীমা ঘুচায়ে’’ এমন একটি মর্মস্পর্ষী গানের সুর ভেসে আসছিলো আদিবাসী অধ্যুষিত নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভার বিরিশিরি এলাকায় স্যার মনিন্দ্র নাথ মারাক এর বাসা থেকে। বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে যুগান্তর কে দেয়া সাক্ষাৎকার দিতে এগিয়ে এলেন গারো স¤প্রদায়ের জ্ঞানতাপস শ্রদ্ধেয় রেভারেন্ট মণীন্দ্রনাথ মারাক। তিনি অত্র দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও ধোবাউড়া এলাকার গারোদের ডিকসেনারী (অভিধান) হিসেবে পরিচিত। তিনি বিরিশিরি ইউনিয়নের হারিয়াউন্দ গ্রামে ১৯৩৭ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারী জন্মগ্রহন করেন।

বয়সের ভার এবং শারীরিক অসুস্থতায় অনেকটাই নির্জিব হয়ে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে তার বয়স ৮২। বিরিশিরি‘র পশ্চিম উৎরাইল এলাকায় ছায়া নিবিড় নানা ফুল ও ফলের গাছে ভরা পরিপাটি বাড়ীতে বসবাস করেন তিনি। সংসার জীবনে দুই ছেলে এক মেয়ে‘র জনক তিনি। মেয়ে ফৈবী দারিং ও ছোট ছেলে সার্জিয়াস মারাক পড়াশোনা ও চাকুরির পাশাপাশি দুজনই বাবার মতো আদিবাসীদের বিভিন্ন অধিকার নিয়ে লেখালেখি করেন। বড় ছেলে মঞ্জুল মারাক এলাকাতেই বাবা মা কে দেখভাল করার জন্য এলাকাতেই থেকে গেছেন।

স্ত্রী প্রতিমা দারিং (৭৮) আদিবাসী নেত্রী। নারী সংগঠন ওয়াইডবিøউসিএ‘র সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে বহুদিন চাকরি করা পাশাপাশি আদিবাসী নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। স্পষ্টভাষী প্রতিমা মারাক সর্বক্ষণ স্বামী এম এন মারাক কে দেখভাল করছেন।

জ্ঞানতাপস পন্ডিতজন রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক শত ব্যস্ততা এবং অসুস্থ্যতার নিয়েও নিবিড়ভাবে সাহিত্য সাধনা করে যাচ্ছেন, নিয়ম করে সকাল-বিকাল-রাতে বই পড়েন। খোঁজ রাখেন শিল্প-সংস্কৃতির। আদিবাসী সম্প্রদায়ের, কেমন আছেন তার প্রিয় জনগোষ্ঠী। প্রতিদিন রাতে রাত দশটার খবর দেখে নানা বিষয় নিয়ে লিখতে তিনি। অন্যান্য লিখার পাশাপাশি প্রতিদিনই ডাইরি লিখাটা তিনি নিয়ম করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, হয়তো আমি একদিন থাকবো না, আমার এই লিখা পড়ে যদি একজনেরও উপকারে আসে তবেই আমি স্বার্থক।

তিনি আদিবাসীদের ধর্মীয় পুরোহীত হিসেবেও বেশ খ্যাতি রয়েছে এলাকাতে। ওই সম্প্রদায়ের যে কোন নর-নারী মৃত্যুবরণ করেন, ছুটে যান তাদের বাড়ীতে, সকলকে নিয়ে মৃতের সমাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ধর্মীয় রিতিনীতি শেষ করেন। গারো সমাজের মন্ডলী আছে। মন্ডলীর নেতা হিসেবেও নানা কাজ ও সভায় ডাক পেলে সঠিক সময়ে হাজির হয়ে যান তিনি। এ যেন অভ্যাসে পরিনত করেছেন এই মহান পন্ডিত ব্যক্তি এমএন মারাক।

স্থানীয় মিশনারী স্কুল থেকে এসএসসি, কলেজ থেকে এইসএসসি ও ময়মনসিংহ থেকে ডিগ্রি পাশ করে স্থানীয় মিশনারী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তি সময়ে এমএড কোর্স শেষ করে অত্র এলকার প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান প্রাইমারী ট্রেনিং ইনিস্টিটিউটে শিক্ষকতা হিসেবে যোগদান করেন। ওখানে একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন চাকুরি করার পর তৎকালী প্রিন্সিপাল বরদা কান্ত সাংমা অবসরে যাওয়ায় জিবিসি ম্যানেজিং কমিটি উনাকে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংশ নিতে চেয়েও পারেননি তিনি। যে মিশনারী স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সেই মাঠেই ছিলো হানাদার বাহিনীর বাঙ্কার। স্কুলের কার্যক্রম তেমন না চললেও শিক্ষকদের হাজিরা দিতে হতো প্রতিদিন। তবে নানা বিষয়ের খবরা খবর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার কারনে নানা অপারেশন ভেস্তে গিয়েছে হানাদার বাহিনীর। মেসেঞ্জারে ইংরেজীতে টিঠি আসতো হানাদারদের বাঙ্কারে। কমান্ডারের নির্দেশে সোবেদার নিয়ে আসতো আমার কাছে অনুবাদ করে দেয়ার জন্য। একদিন মেসেজ আসলো স্থানীয় মোড়ল, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের ধরে এনে হত্যা করতে। আমি জীবন বাজী রেখে ভুল অনুবাদ করে বলেছিলাম, উল্লেখিত ব্যক্তিরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে কিনা তা জিজ্ঞাসাবাদ করতে। এরপর ৩দিন অসুস্থতার নাম করে স্কুলে না গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সহ এলাকার গ্রাম্য মোড়ল, শিক্ষক ও ব্যবসায়িদের সতর্কতা করে দিয়েছি। ৩দিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় স্কুলে এসেছি।

স্বাধীনতার পরবর্তি সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও স্থানীয়দের উন্নয়নে বিনা পারিশ্রমিকে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পাশাপাশি আদিবাসীদের জীবন মান উন্নয়নে এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। গারোদের সংস্কৃতি ভাবনা, গারো সংস্কৃতি, গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, মান্দিদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, গারো সংস্কৃতি ও সমসাময়িক ভাবনা, ধর্মীয় চেতানায় মান্দি সংস্কৃতি, গারো চেতনায় মান্দি সংস্কৃতি, নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষায় গারোদের ভূমিকা, সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা, গারো আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও তাহার ভবিষ্যৎ ভাবনা, যুগোপযোগীভাবে সংস্কৃতি সংরক্ষণে আমাদের করণীয় এ বিষয় গুলো নিয়ে তিনি ১৯াট খন্ডে ৫াট বই লিখেছেন। গারো ব্যপ্টিষ্ট কনভেনশন (জিবিসি) শিক্ষাবোর্ড, কালচারাল একাডেমি, কাল্ব, এনজিও পরিষদ, মিশনারী পরিষদ সহ নানা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এছাড়া জিবিসি এর সাধারণ সম্পাদক পর নির্বাচিত হওয়ায় পরবর্তি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন পর পর ৩ বার। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মেনেজিং বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নির্বাচিত ছিলেন এই জ্ঞানগর্ভা মনীন্দ্র নাথ মারাক।

তিনি আক্ষেপ করে এ প্রতিনিধি কে বলেন, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চারটি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের গারো, কোচ, খাড়িয়া, বর্মণ এবং ডালু প্রভৃতি আদিবাসী দের বসবাস। অত্র এলাকায় বসবাসরত পাহাড়ী আদিবাসীদের চরম দুরবস্থা। ভূমি বেদখল হতে হতে এখন কোন রকমে টিকে আছি আমরা। অথচ দশ বছর আগেও আমাদের পরিবার ছিল অনেক আর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো। এভাবেই ভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে হতে এখন আমাদের অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার উপক্রম। আমাদের নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে বসবাস করার অধিকার পর্যন্ত হারাতে বসেছি আমরা।

এসব অঞ্চলের গারো আদিবাসীদের একটা বড় অংশ এখন আদি পৈত্রিক ভিটামাটি ছেড়ে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলোর স্থানীয় অভিবাসী হিসেবে দিনযাপন করছে। সরকারি আর বেসরকারি ভূমিদখলের অব্যাহত প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার গারোদের জীবন ও জীবিকা সংকটাপন্ন।

পাকিন্তান আমলে ১৯৬৫ সালে ন্যাশনাল পার্কের নামে গারোদের ৪২,০০০ একর জমি সরকারিভাবে দখল করে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ আমলে ১৯৮৬ সালে সেই ন্যাশনাল পার্কই ‘মধুপুর ইকোপার্কের’ নামে প্রায় ৩০,৮৩৭ একর জায়গা সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০২ সালে থেকে ইকোপার্কের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারি ৯১৪৫ একর জমি রিজার্ভ ফরেস্টের নামে সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। এভাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো আদিবাসী মানুষ ভূমি ও বন দুটোই হারিয়ে জীবন-জীবিকার চরম সংকটে রয়েছে।

তিনি বলেন, মানব জাতিসত্বা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্ম চিন্তা নিয়ে জানার আগ্রহ থাকার কারনেই এখনো নিয়মিত লেখালেখি, টুকটাক বই পড়া ও টিভি দেখে সময় কেটে যায়। বয়সের কারণে শরীর তেমন সুবিধার না হলেও তিনি নিয়ম করে ওষুধ খাচ্ছেন, হাঁটাহাঁটি করছেন। কিন্তু এই করোনা কালে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। আর মাস্ক পরতে ভুল করেন না। এছাড়া সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করতেও ভুল করেন না। তিনি আশা করছেন করোনার এই ঘোর অমানিশা হয়তো একদিন কেটে যাবে, কিন্ত এ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহন করেছি অনেক। মহান সৃষ্টি কর্তার কাছে দেশ ও জাতির জন্য বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রার্থনা করেন প্রতিনিয়ত।

তার জীবন সায়াহ্নে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটা স্বতন্ত্র ভূমি কমিশনের দাবি তুলে ধরেছেন মাননীয় সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন অনেক বার। অথচ রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। আদিবাসী জনগণ সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হওয়ার কারণে বাঙালি ভূমিদস্যুদের কাছে ক্রমান্বয়ে ভূমি হারিয়ে উদ্বাস্ত ও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছে আদিবাসীদের অধিকার ও ভুমি রক্ষায় আলাদা আইন করে জাতী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জোর দাবী জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Theme Created By ThemesDealer.Com