Logo
নোটিশ ::
Wellcome to our website...

নেত্রকোনায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শীর্ষক অনলাইন সভা

রিপোর্টারের নাম / ৬৬ বার
আপডেট সময় :: রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

দিগন্ত ডেক্স : নেত্রকোনায় বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘‘বারসিক’’ নেত্রকোনা অঞ্চলের আয়োজনে “নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য” শীর্ষক এক অনলাইন ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার দুপুরে সর্বস্তরের অংশগ্রহনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো: অহিদুর রহমান এর সঞ্চালনায়, স্বাগত বক্তব্য রাখেন, বারসিক নেত্রকোনা অঞ্চলের পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস, প্রধান আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, মহুয়া মলুয়ার দেশ নেত্রকোনার সন্তান, দেশ বরেণ্য ও বাঙ্গালীর গর্ব, কবি নির্মলেন্দু গুণ। এছাড়া বারসিক নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও রাজশাহী অঞ্চলের কর্মকর্তাগন সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও ভাষা-ভাষির ৭৮ জন নারী-পুরুষ এ মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন।

নেত্রকোনা জেলার দু’টি জনপদ, ‘‘দূর্গাপুর ও কলমাকান্দা’’ উপজেলায় বাঙ্গালীসহ ছয়টি জাতি স্বত্ত¡ার (গারো, হাজং, বানাই, লেঙ্গাম, হুদি) বসবাস, যারা ভিন্ন ধর্ম বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ভাষাভাষি ও পেশায় নির্ভর। এছাড়াও নেত্রকোনা অঞ্চলে কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, কবি, সাহিত্যিক, নাট্য ব্যক্তিত্ব, কবিরাজসহ বিভিন্ন পেশার লোক বাস করেন। এ বিষয় গুলো নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিষয়ে আলোচনার শুরুতে অংশগ্রহণকারী সকলকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর বিশ্ব ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করেন।

করেনা সংক্রমণ রোধে সব সময় মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বলতে “আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে বা জীবনে যা কিছু হয়েছে সব কিছু নিয়েই আমাদের সংস্কৃতি। শুধুমাত্র গান বাজনা, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, পুঁথি পাঠ, নাটক, যাত্রা এগুলোই সংস্কৃতি নয়। আমাদের পোষাক-আষাক, খাবার, অভ্যাস এসব কিছুও সংস্কৃতির অংশ। বৃটিশদের দ্বারা চা খাওয়া ও চেয়ারে বসার অভাস আমরা শিখেছি, যা বর্তমানে আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চ্যানেলে এখন নেত্রকোনার অনেক কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর গান প্রচার হচ্ছে।

এ অঞ্চলের অনেক নাট্যকার, কবি, গীতিকার অনেক উল্লেযোগ্য ও সমৃদ্ধ কাব্য গ্রন্থ, গীতিনাট্য, নাটক, চলচিত্র, যাত্রাপালা লিখেছেন। এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে দেশ বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আহম্মদ, অধ্যাপক জাফর ইকবাল, কান্নুপা, বারি সিদ্দিকী, বাউল শিল্পী উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দিন, রাধা রমন উল্লেখযোগ্য। হুমায়ুন আহম্মদ নেত্রকোনা অঞ্চলের সাংস্কৃতিমনা ব্যক্তিদেরকে নিয়ে তার নাটক ও সিনেমাতে অভিনয় করিয়েছেন। তার লেখা অনেক গান নেত্রকোনার শিল্পীদের দিয়ে গাইয়েছেন।” তিনি নেত্রকোনা অঞ্চলের সীমান্ত এলাকার আদিবাসীদের গারো, হাজং ও হুদিদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কেও সংক্ষেপে আলোচনা করেন।

তিনি আরও কলেন,“নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক ইতিহাস হাজার বছরের চর্যাপদ এর সাথে তুলনীয়। ময়মনসিংহ গীতিকায় নেত্রকোনার সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। চর্যাপদের পূর্বে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা ছিলনা। কিন্তু বর্তমানে নেত্রকোনা অঞ্চলের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয়। নেত্রকোনায় হিন্দু, মুসলিম, খ্রীষ্টান, সনাতন ধর্মাবলম্বী বসবাস করেন। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের সংস্কৃতিতে প্রাশ্চাত্য (ইংরেজদের সংস্কৃতি) সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যেমন-বসার চেয়ার, আসবাবপত্র, পোষাক, ভাষা, খাদ্য, সম্বোধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।”

তিনি মনে করেন, বর্তমান আধুনিক কালে সাংস্কৃতির অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিছু ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রের তবিয়তে এখন ঘরে বসেই দেশ-বিদেশের লোকদের সাথে ভার্চুয়াল কথা বলা, সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ করা সহজ হয়েছে। ঘরে বসেই অল্প সময়ের মধ্যে দেশ-বিদেশের মালামাল পাওয়া যাচ্ছে, যা’ আগে কল্পনাতেও সম্ভব ছিলনা। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়ে জাহাজে করে অনেক দিন সময় ধরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে হত। বিমান আবিষ্কারের পর থেকে দেশ-বিদেশে যাতায়াত সময়ের ব্যাপার মাত্র। যোগাযোগ মাধ্যমের যুগান্তকারী উন্নয়নের ফলে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানুষের সহজ যোগাযোগ ঘটায় আমাদের সংস্কৃতিতে ভিন দেশী সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে। দেশের অনেক স্থান রয়েছে যেগুলো বাংলার চেয়ে ইংরেজী ভাষায় বেশি পরিচিত। অনেক ইংরেজী শব্দ মনের ভাব প্রকাশকে আরো সহজ করেছে। প্রত্যেকটা অঞ্চলের আলাদা আলাদা আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে, আমরা এলাকার লোকদের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে থাকি।

কবি নির্মলেন্দু গুণ আরো বলেন,“কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে। কৃষি, মৎস্য চাষ, গবাদী পশু-পাখি পালনের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রীড জাত আসায় খাদ্য উৎপাদনেও দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের দেশ এখন বিভিন্ন দেশে খাদ্য রপ্তানী করছে। দু’টি দেশে খাদ্য সহায়তা পাঠাচ্ছে। নেত্রকোনা অঞ্চলের সংস্কৃতি অনেক উন্নত। এ অঞ্চলে একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচিত্রকার ও শিক্ষাবিদ হুমায়ুন আহম্মদ, অধ্যাপক জাফর ইকবাল, বিখ্যাত বাউল শিল্পী বারি সিদ্দিকী, উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দিন, রাধা রমন, নবী বাউল, মিরাজ আলী, জালাল খাঁ, কাশিমপুরি, রওশন এজদানী, পালাকার মনিন্দনাথ সেন, বাউল অসিম উদ্দিন সহ অনেক বড় বড় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের জন্ম হয়েছে। তাঁদের ছোঁয়ায় বাংলা সংস্কৃতি তথা নেত্রকোনা অঞ্চলের সংস্কৃতি অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্ব সংস্কৃতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান বাংলা সংস্কৃতি এখন অনেক উন্নত। তাই এখন শুধুমাত্র নেত্রকোনার সংস্কৃতি নিয়ে থাকলেই চলবেনা, স্থানীয় সংস্কৃতির চর্চার পাশাপাশি ভিন্ন অঞ্চল ও দেশের সংস্কৃতিরও চর্চা করতে হবে। তবেই আমাদের বাংলা সংস্কৃতিসহ নেত্রকোণা অঞ্চলের সংস্কৃতি বিশ্বের অন্যান্য সংস্কৃতির সমকক্ষ হবে। এজন্য বিভিন্ন লাইব্রেরীতে প্রাপ্ত দেশি-বিদেশী সংস্কৃতির বই সকলকে পড়তে হবে।”

আলোচনা শেষে কবি নির্মলেন্দু গুণ অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। হাওর সংস্কৃতি রক্ষায় করণীয় সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,“নেত্রকোনার সংস্কৃতি মোবাইলে রেকর্ড করে ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার করে সারা বিশ্বের মানুষের নিকট পৌছে দিতে হবে। কারণ সাংস্কৃতিক প্রচারণার খুব সহজ মাধ্যম এখন ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া।” কাব্যগ্রন্থ ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত ময়মনসিংক গীতিকা সংক্ষেপে আলোকপাত করেন।কবি নির্মলেন্দু গুণ এর আলোচনার ফলে নেত্রকোনা অঞ্চলসহ দেশের ৭৮ জন অংশগ্রহণকারী নেত্রকোনা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে সমৃদ্ধ হয়েছে।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মো: অহিদুর রহমান বলেন, কবির তৈরী রামসুন্দর পাঠাগার, সাংস্কৃতিক বলয়, কবিতাকুঞ্জ, শ্বশানবন্ধু পাঠাগার অপূর্ব সৃষ্টি। এসব পাঠাগারে সংগৃহিত আছে শত শত দূর্লভ কাব্যগ্রন্থ, কবিতা, উপন্যাস। আমাদের এগুলো জানতে হবে, দেখতে হবে, পড়তে হবে তবেই রক্ষা পাবে নেত্রকোনার সংস্কৃতি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Theme Created By ThemesDealer.Com