Logo
নোটিশ ::
Wellcome to our website...

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাতেও পিছিয়ে নেই নেত্রকোনার খাদ্যযোদ্ধারা

রিপোর্টারের নাম / ৪৯ বার
আপডেট সময় :: বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০

পার্বতী রানী সিংহ, নেত্রকোনা থেকে : কৃষি প্রধান দেশ বাংলাদেশ, এ দেশের প্রায় ৮০ভাগ পরিবারের জীবিকাই হল কৃষি। আর কৃষি অনেকাংশেই নির্ভরশীল প্রকৃতির উপর। পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকুল হলেই কৃষি উৎপাদন ভাল হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের ফলে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কৃষির উপর। স্বাভাবিকভাবেই কৃষির উপর ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে বর্তায় কৃষক পরিবারের উপর।

জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে দ্রæত গতিতে। চলতি খরিপ-২ ও রবি মৌসুমে দেশের সকল এলাকার কৃষকদেরকে ২/৩ বার করে জমিতে শস্য ফসলের বীজ বপন করতে হয়েছে। চলতি মৌসুমটি কৃষির জন্য প্রতিকূল আবাওয়া হওয়ার ফলে বারবার জমিতে বীজ বপন ও রোপন করে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষক পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এর পরেও আমাদের দেশের খাদ্য যোদ্ধারা থেমে নেই। জমির চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদান, নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কৌশল ব্যবহার করে প্রতিনয়ত খাদ্য উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রাকৃতিক সম্পদকে অবলম্বন করে এবং প্রকৃতির সাথে খাপখাইয়ে দেশের অনেক কৃষক দেশের মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে চলেছেন, যার জন্য আমরা আজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের বামনমোহা গ্রামে এমনই বেশক’জন কৃষকের বসবাস। যারা বছরের প্রায় ৪/৫ মাস কৃষি জমি পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও খাদ্য উৎপাদন থেকে বিরত থাকেননা। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপখাইয়ে খাদ্য উৎপাদন করে নিরলসভাবে। বামনমোহা গ্রামের বিরাট অংশই বিল। বিল এলাকা হওয়ায় কৃষি জমির অধিকাংশই জলাবদ্ধ থাকে, তাই কৃষকরা সবজি চাষ করতে পারেনা। গ্রামের দু’একজন কৃষক রয়েছেন, যারা এই জলাবদ্ধতার সাথে খাপ খাইয়ে প্রতিনিয়ত চাষাবাদের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বামনমোহা গ্রামের এমনই একজন কৃষক দুলাল মিয়া, যিনি অন্যান্য কৃষকদের থেকে ভিন্ন চিন্তা চেতনার ধারণ করেন। তিনি বর্ষা মৌসুমে বাড়ির চারপাশে জমে থাকা কচুরিপানার পর্যাপ্ততাকে কাজে লাগিয়ে এবং পানিজনিত সমস্যাকে সমস্যা মনে না করে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও সবজি চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিলের কচুরিপানা পঁচিয়েছে সার হলে আগাম সবজি চারা উৎপাদনের জন্য তা দিয়ে ছোট ছোট কম্পোস্ট বল তৈরী করেন। পুকুরের পানিতে কলাগাছের ভেলার উপর মাটি দিয়ে ভাসমান বীজতলা তৈরী করে তাতে কচুরিপানার বলগুলো সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে তাতে বৈচিত্র্যময় সবজির বীজ যেমন- লাউ, টমাটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদি বপন করেছেন। জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই যাতে চারাগুলো মূল জমিতে রোপন করা যায় তাই তিনি ভাসমান বীজতলায় আগাম চারা উৎপাদন করেন।

ভাসমান পদ্ধতিতে আগাম সবজির চারা উৎপাদনের কারণ সম্পর্কে কৃষক দুলাল মিয়া বলেন,“ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন করলে গরু-ছাগল, মুরগী ও শিশুদের নাগালের বাইরে থাকে বিধায় চারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা থাকেনা। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে পানির জন্য যাদের চারা উৎপাদনের মত কোন উঁচু জমি নেই তারা সহজেই এ পদ্ধতিতে আগাম চারা তৈরী করে রেখে সবজির সঠিক মৌসুম ধরতে পারে। চারা উৎপাদনের জন্য মূল জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়না। আমার বাড়িটি পুকুরের পাড়ে, চারা উৎপাদনের তেমন কোন উঁচু জমি নেই। তাই আমি ভাসমান বীজতলায় আগাম চারা করে রাখি। অনেক পানি হলেও বীজতলা পানিতে ডুবেনা এবং চারা সুরক্ষিত থাকে। কচুরিপানার কম্পোস্ট বলে লাউ, করলা, বেগুন, শিম ইত্যাদি বীজ রোপন করায় বীজ থেকে চারা দ্রæত অঙ্কুরোদগমন হয় এবং বলসহ চারা জমিতে রোপন সম্ভব হওয়ায় জমিতে রোপনের পর থেকেই চারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। কৃষক দুলাল মিয়া চলতি মৌসুমে সবজি ক্ষেতে গর্তে কচুরিপানা স্তুপ করে পঁচিয়ে লাউ ও করলা চাষ করেছেন। এতে করে সবজি উৎপাদনে তাকে বাড়তি কোন রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়নি এবং অতিবৃষ্টি ও রোদে চারা গ্রতিগ্রস্তহওয়া থেকে সুরক্ষিত হয়েছে। যেখানে কৃষকরা সবজি চাষ করতে না পেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে হতাশায় দিন যাপন করছে, সেখানে দুলাল মিয়া নিজের প্রতিকূলতাকে শুধুমাত্র নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের দ্বারা মোকাবেলা করে সফল হয়েছেন এবং সামনে এগিয়ে চলেছেন, অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন গ্রামের অন্যান্য কৃষকদেরও।

কৃষক দুলাল মিয়াকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে একই গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ (৪৮) চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে কচুরিপানা ব্যবহার করে সবজি চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বিলের জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য কচুরিপানা দিয়ে ২ ফুট পুরু, ৩ ফুট প্রস্ত ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের ০৮টি ভাসমান বেড তৈরী করেছেন। বসতবাড়িতেও কচুরিপানার ১৫০০টি ছোট ছোট কম্পোস্ট বল তৈরী করে তাতে লাউয়ের চারা উৎপাদন করেছেন। লাউয়ের চারাগুলো রোপনের উপযোগি হলে কচুরিপানার ভাসমান বেডে সামান্য গর্ত করে সেগুলো রোপন করেছেন। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিলের পানি শুকিয়ে গেলে ভাসমান বেডগুলো জমিতে বসে যাবে। আর এতে তিনি কার্তিক মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস ধাপে ধাপে লাউশাক, মিষ্টিকুমড়া ও করলা চাষ করবেন। বাড়ির চারপাশে ও জমিতে ঝঞ্জাল হিসেবে জম্মানো আগাছাগুলো সঠিক ব্যবস্থানার মাধ্যমে কৃষক দুলাল মিয়া ও কৃষক আব্দুল হামিদের মত কৃষকদের এই ধরনের কৌশল রাসায়নিক কৃষির সাথে প্রতিযোগিতায় স্থায়ীত্বশীল ও টেকসই কৃষির টিকে থাকার অনন্ত প্রচেষ্টা। মাটি হারিয়ে ফেলছে তার প্রাকৃতিক উৎপাদন ক্ষমতা। কিন্তু মানুষ মাটির ভবিষ্যতের কথা না ভেবে শুধু মাটির কাছে চেয়েই চলেছে। মাটির টেকসই উন্নয়নে নিচ্ছেনা কোন স্থায়ী উদ্যোগ। বহুজাতিক কোম্পানীর চোখধাঁধানো প্রচারণায় দেশের প্রায় সকল কৃষক আজ বিমোহিত। দেশের কৃষিতে কোম্পানীর দৌরাত্ত¡কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বামনমোহা গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া, কৃষক আব্দুল হামিদ ও আব্দুল কাইয়ুমরা টেকসই কৃষির জন্য পরিবেশবান্ধব অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Theme Created By ThemesDealer.Com